রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘অস্থিরতা’ সৃষ্টি করতে চায় মিয়ানমার!, আসছে অস্ত্র

উখিয়ার ৫ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২ দিনের লকডাউন

ডেস্ক রিপোর্ট
বিসিবিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

কক্সবাজারের আলোচিত উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে অস্ত্র নিয়ে এখন আর কোনো রাখঢাক নেই! একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সেখানে সক্রিয়, তাদের সবার হাতেই রয়েছে আধুনিক অস্ত্র। সেই অস্ত্র তারা ব্যবহার করছে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী আর প্রভাব বিস্তারের কাজে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এই অবৈধ অস্ত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরের ডি ব্লকের আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) সংগঠনের কার্যালয়ে শীর্ষ রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যা এবং গত ২২ অক্টোবর রাতে বালুখালী ক্যাম্প-১৮-এর এইচ-৫২ ব্লকে দারুল উলুম নাদওয়াতুল ওলামা আল ইসলামিয়াহ মাদ্রাসায় হামলা চালিয়ে ছয় রোহিঙ্গা হত্যার ঘটনা একই সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের পরিকল্পিত মিশন ছিল।

পুলিশ সূত্র বলছে, রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে যে পাঁচ অস্ত্রধারী ছিলেন, তারা সবাই ভারী আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহার করেন। সবশেষ শুক্রবার ভোররাতে যে ছয়জনকে খুন করা হয়, সেখানে বিদেশি অস্ত্রের পাশাপাশি দেশি আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করা হয়। আর এ পর্যন্ত যত অস্ত্র ধরা পড়েছে তার বেশিরভাগই বিদেশে তৈরী।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোত্থেকে এলো এত অস্ত্র?
কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্য মতে, ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে টেকনাফ ও উখিয়া থানায় অস্ত্র মামলা হয়েছিল ১৭টি৷ ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৭টি। আর চলতি বছরের ৯ মাসে ১৫টি অস্ত্র মামলা হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ১৪টি দেশীয় পিস্তল, ৪৪টি এলজি, ৩টি বিদেশি পিস্তল, ৩০টি একনলা বন্দুক, ২৫টি দেশি বন্দুক, ৪টি পাইপগানসহ প্রচুর পরিমাণ ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই সময়ের মধ্যে ১২৩টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।

সীমান্ত ও ক্যাম্প নিয়ে কাজ করেন এমন একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে মাদক চালানের সঙ্গে অস্ত্র আসছে এতে কোনও সন্দেহ নেই। মাদকের মূল হোতারা মাদক পাচারকালে ব্যবহারের জন্য তাদের বহনকারীদের হাতে তুলে দিচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র। আবার অনেকে মাদক বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করছে রোহিঙ্গাদের। সেই সুবাদে ক্যাম্পে তারা যেকোনও কর্মকাণ্ডে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করছে। এতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক এক সভায় বলেছেন, ক্যাম্পগুলোয় ‘অস্থিরতা’ সৃষ্টির চেষ্টায় ‘মিয়ানমার’ থেকে অস্ত্র আসছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে নিজেরাই অস্ত্র তৈরি করছেন রোহিঙ্গারা। অস্ত্র তৈরির কাজে লাগাচ্ছেন মহেশখালীর অস্ত্রের কারিগরদের।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র বলছে, মহেশখালীতে জলদস্যুতা ছেড়ে আত্মসমর্পণ করা ৯৬ আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পুরোনো ব্যবসায় ফিরে গেছেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।

মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল হাই নিজেও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, আগস্ট মাসে পাহাড়ে কারখানা থেকে পাঁচটি নতুন তৈরি অস্ত্র ও সরঞ্জামসহ মাহমুদুল করিম (৩০) নামের এক কারিগরকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছেন।

র‍্যাব বলছে, গত বছরের ৫ অক্টোবর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে তারা একটি অস্ত্র তৈরির কারখানার খোঁজ পায়। সেখান থেকে অস্ত্র তৈরির দুই কারিগরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নাম না বলার শর্তে উখিয়া ক্যাম্পের কয়েকজন রোহিঙ্গা মাঝি (নেতা) বলেন, ‘ক্যাম্পের অবস্থা ভয়াবহ। ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের হাতে হাতে অত্যাধুনিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। সেসব অস্ত্র নিয়ে তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, আগে কি হয়েছে জানি না। ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ এখন শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকবে।

পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে গত ৪ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নানা কোন্দলে ১১৪ জন খুন হয়েছেন। সম্প্রতি মুহিবুল্লাহ ও ছয় খুনের তথ্য যোগ করে বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি (বিপিও) এই তথ্য জানিয়েছে। প্রতিটি খুনের ঘটনায়ই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কিছু উল্লেখ করেনি পুলিশ।

শুধু খুনোখুনি নয়, পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ৪ বছরে টেকনাফ ও উখিয়া থানায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নানা অপরাধে ১ হাজার ৩৬৯টি মামলা হয়েছে। মাদক, খুন, ডাকাতি, ধর্ষণের মামলায় আসামি করা হয় ২ হাজার ৩৮৫ জনকে। যাদের মধ্যে ১ হাজার ৭৬১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কিন্তু তারপরও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ কমছে না।

তবে এত মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সত্যি তারা হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে আরও ফোর্স বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।

কক্সবাজারের ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও পুলিশ সুপার (এসপি) নাইমুল হক বলেন, ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের কাছে অনেক অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সিহাব কায়সার খান বলেন, এই ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি অপরাধীদের ধরতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলোচিত এই দুই হত্যাকান্ডের ঘটনার পর থেকেই আতঙ্কে রয়েছে রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ক্যাম্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহলও বাড়ানো হয়েছে।

বালুখালী ক্যাম্পের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার এবং ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটছে। মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গ্রুপ আরসা বা আল ইয়াকিনের নামে একটি পক্ষ ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া। অন্যদিকে আরএসও এবং ইসলামী মাহাস নামে আরও দুটি সংগঠনও ক্যাম্পে তৎপরতা চালাচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের হাতে এসব অস্ত্রই প্রমাণ করে বিদেশ থেকে অস্ত্র আনছে তারা।

সূত্র জানায়, ‘উলামা কাউন্সিল’ নামে একটি সংগঠন রোহিঙ্গা শিবিরে দেড়শতাধিক মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়। এ সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘আরসা’র কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা। সংগঠনের সভাপতি হচ্ছেন রোহিঙ্গা নেতা হাফিজুল্লাহ। তিনি ক্যাম্পের বাইরে থাকেন। অন্যদিকে ‘ইসলামী মাহাস’ নামে সংগঠনটিও একই তৎপরতা চালাচ্ছে ক্যাম্পে। এ সংগঠনের নেতা মৌলভী সেলিম উল্লাহ। তিনি এক সময় ‘আরসা’র কমান্ডার ছিলেন। আরসা ছেড়ে পরে তিনি ‘ইসলামী মাহাস’ গড়ে তোলেন। দারুল উলুম নাদওয়াতুল ওলামা আল ইসলামিয়াহ মাদ্রাসাটি ছিল এই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। এ নিয়ে দু’পক্ষের বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আরসা’র নাম দিয়ে অনেকবার হুমকি দেয়া হয়েছে ওই মাদ্রাসার শিক্ষক-পরিচালকদের।

সূত্র জানায়, ‘ইসলামী মাহাস’ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে থাকলেও উলামা কাউন্সিল বিপক্ষে। এছাড়া মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর ‘ইসলামী মাহাস’ পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে বলে আরসা’র সমর্থনপুষ্ট সন্ত্রাসীরা মাদ্রাসাটির ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। এর জেরে ওই হামলা হয়।

ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্যাম্পে সন্ত্রাসী-জঙ্গি গ্রুপগুলো মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায় জড়িত।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নানা ধরনের অপরাধ হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে এত মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সত্যি তারা হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে আরও ফোর্স বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।

ক্যাম্পের অস্ত্রধারিরা
সম্প্রতি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্ত্রধারি সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফলে তাদের ধরতে মাঠে নেমেছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অস্ত্রধারীদের মধ্যে আব্দুল হাকিম, মো. আনাস, মাহাদ, মুন্না, হাফেজ, মো. ইউনুছ, শাহ আলম, পুতিয়া, মো. খালেক, রাশেদ, জকির আহমদ ওরফে জকির ডাকাত, হাসান ওরফে কামাল, খলিফা সেলিম, খায়রুল নবী, মোহাম্মদ রাজ্জাক, মোহাম্মদ রফিক, দোস মোহাম্মদ, নুরু মিয়া প্রকাশ ভুইল্ল্যা, মোহাম্মদ নুর, বনি আমিন, সালমান শাহ, রশিদ উল্লাহ, খায়রুল আমিন, মহিউদ্দিন ওরফে মাহিন, সাদ্দাম হোসেনসহ আরও অনেকে রয়েছে।

তারা সবাই উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পের বাসিন্দা। এসব বাহিনীর কাছে একাধিক দেশীয় তৈরি বন্দুকসহ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে।

এই পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ