তিন ছেলে-মেয়ে ‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে’, ছোট ভাইকে করতে হলো সুরেশ সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্টান

তিন ছেলে-মেয়ে ‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে’, ছোট ভাইকে করতে হলো সুরেশ সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্টান

নিজস্ব প্রতিবেদক, চকরিয়া (কক্সবাজার)
বিসিবিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

সদ্যপ্রয়াত স্বাস্থ্য পরিদর্শক সুরেশ চন্দ্র সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্টান উপলক্ষে বাড়ির প্রবেশ পথে নির্মিত তোরণের কাপড় খুলে ফেলা হয়েছে। শুধু বাড়ির উঠানেই একটি সামিয়ানা টাঙ্গানো। এর মধ্যেই চলছে মৃত ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্টান।

শুধু ধর্মীয় রীতিই পালন করা হচ্ছে। চারিদিকে আড়ম্বরহীন। থেমে থেমে শুধুই কান্নার শব্দ স্বজনদের।

ডুলাহাজারা মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্লাবন সুশীলকে বাবার শ্রাদ্ধানুষ্টান করার জন্য নিয়ে আসা হলেও সে বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় বাবাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে পারেননি। চেয়ার নিয়ে এক পাশে বসে আছেন মৃত সুরেশ সুশীলের স্ত্রী মৃণালিনী বালা সুশীল মানু। অন্যপাশে স্বামীহারা স্ত্রী ও সন্তানরা কান্নাকাটি করছেন।

এই দৃশ্য দেখে পাড়া-প্রতিবেশী নারী-পুরুষরা বাকরুদ্ধ, কেউ কেউ কাঁদছেনও। এ যেন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।

বুধবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডস্থ হাসিনা পাড়ায় মৃত ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এই মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক চিত্র।

তিন ছেলে-মেয়ে ‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে’, ছোট ভাইকে করতে হলো সুরেশ সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্টান

বুধবার সুরেশ চন্দ্র সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্টান উপলক্ষে বাড়িতে টাঙ্গানো হয়েছিল সামিয়ানা। বুধবার (৯ ফেব্রুয়ারি) প্রায় দেড়-দুই হাজার পাড়া-প্রতিবেশির জন্য আয়োজন করা হয়েছিল শাকান্ন ভোজের। কিন্তু ঘাতক একটি পিকআপের চাপায় এক সাথে পাঁচ সন্তানের মৃত্যুতে সব কিছুই পন্ড হয়ে গেছে। সুরেশ চন্দ্র সুশীলের বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় চলছে শোকের মাতম।

হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বাবা মারা গেলে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে শুরু করে শ্রাদ্ধানুষ্টান সবকিছুই করতে হয় সন্তানদের। মঙ্গলবার (৮ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আট ভাই-বোন ক্ষুদান্ন দান (ধান, সুই ও ফুল) অনুষ্টানের জন্য গিয়েছিলেন সড়কের পাশে একটি বটগাছের নিচে। যথারীতি তারা ক্ষুদান্ন অনুষ্টানটিও শেষ করেন। বাড়ি ফেরার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সবাই। কিন্তু একটি পিকআপ তাদের বাবার শেষ অনুষ্টান শ্রাদ্ধও করতে দিলো না। সন্তানের পরিবর্তে তাদের কাকা চিত্তরঞ্জন সুশীলকে করতে হলো ভাইয়ের শ্রাদ্ধানুষ্টান!

মৃত ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের ভাই চিত্তরঞ্জন সুশীল বলেন, বড় ভাইয়ের শ্রাদ্ধানুষ্টান উপলক্ষে সোমবার রাতে এসেছি। ভাইকে এভাবে বিদায় জানাতে হবে ভাবতেও পারিনি। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সন্তানদেরই বাবার শ্রাদ্ধানুষ্টান করার নিয়ম। সেখানে আমাকে বড় ভাইয়ের শ্রাদ্ধানুষ্টান করতে হবে চিন্তাতেও ছিল না।

মৃত ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের স্ত্রী মৃণালিনী বালা সুশীল মানু কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। স্বামী গেছে, সন্তানরাও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমারও বাঁচার ইচ্ছে নেই। আমি এই ছোট-ছোট নাতি-নাতনিদের মুখ দেখতে পারছি না। ওদের দিকে থাকাতে পারছি না।

এ সময় তিনি তার গুরুতর আহত তিন সন্তানকে বাঁচানোর জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

পিকআপের চাকায় পিষ্ট আপন ৪ ভাই, মৃত্যুযন্ত্রণায় আরও ৩ ভাই-বোন

সেদিন যা ঘটেছিল
বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী ছোট বোন মুন্নি সুশীল বলেন, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃত বাবার শ্রাদ্ধানুষ্টান করার আগে ক্ষুদান্ন ও ক্ষৌরকর্ম করতে হয়। এজন্য মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আমিসহ আমার ভাই অনুপম, নিরুপম, দিপক, চম্পক, স্মরণ, রক্তিম, প্লাবন ও বোন হীরা সুশীল ক্ষুদান্ন দান করতে বাড়ির অদূরে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্বপাশে বটগাছের নিচে যাই। মুলত সুর্য উদয়ের আগেই এই কাজটি সম্পন্ন করতে হয়।

তিনি বলেন, আমরা সবাই ক্ষুদান্ন শেষ করে বাড়ি ফেরার জন্য দুই সারি করে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছিলাম। প্রথম সারিতে ভাইয়েরা, দ্বিতীয় সারিতে আমি, ছোট বোন হীরা ও ছোট ভাই প্লাবন। এসময় চকরিয়া থেকে কক্সবাজারমুখি একটি সবজি বোঝাই পিকআপ আমাদের ভাইদের চাপা দেয়। এর পরপরই ভাইয়েরা সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল। পরে ওই পিকআপটি একটি খুঁটির সাথে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেলে চালক গাড়িটি পেছনের দিকে এসে আবারও ভাইদের চাপা দিয়ে কক্সবাজারের দিকে পালিয়ে যায়।

এ সময় ঘটনাস্থলে মারা যান চার ভাই অনুপম, নিরুপম, দিপক ও চম্পক। গুরুতর আহত হন স্মরণ, রক্তিম, প্লাবন ও ছোট বোন হীরা। পরে স্থানীয় লোকজন এসে তাদের উদ্ধার করে মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে গুরুত্বর আহত স্মরণ ও রক্তিমকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ওখানে মঙ্গলবার বিকেলে ভাই স্মরণ সুশীল মারা যান।

মুন্নি সুশীল বলেন, আরেক ভাই রক্তিম সুশীল এখন চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছেন। জানি না ওই ভাইকে বাঁচাতে পারবো কিনা।

এসব কথা বলতে বলতে মাঝে-মধ্যেই জ্ঞান হারাচ্ছিলেন মুন্নি সুশীল।

সদ্য জন্ম নেয়া মেয়ের নাম রেখে যেতে পারলেন না স্মরণ সুশীল
মাত্র একমাস আগে স্মরণের ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যা সন্তান। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সন্তান জন্ম নেয়ার ২১ দিনের মধ্যে নামকরণ করতে হয়। কিন্তু ২১ দিনের মধ্যে বাবা মারা যাওয়ায় সেই নামকরণ অনুষ্টানটিও করা হয়নি স্মরণের।

তাছাড়াও আগামী মাসে তার বিদেশ যাওয়ার কথা ছিল। স্বপ্ন ছিল বিদেশ গিয়ে টাকা উপার্জন করে স্বাবলম্বী হবেন। কিন্তু তার সেই মেয়ের নাম রাখা ও বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে।

তিন ছেলে-মেয়ে ‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে’, ছোট ভাইকে করতে হলো সুরেশ সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্টান

বাবার শ্রাদ্ধ করতে এসে জীবন প্রদীপ নিভে গেলো দিপকের
প্রায় ৮-১০ বছর আগে পরিবারকে স্বচ্ছল করতে কাতার গিয়েছিলেন দিপক সুশীল। বাবা ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে না পারলেও শ্রাদ্ধানুষ্টান করার জন্য দেশে ফিরেছিলেন ৬ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু বাবার শ্রাদ্ধ করতে এসে তিনি পরলোকগমন করায় তারই ছোট্ট সন্তানকে করতে হচ্ছে বাবা দিপক সুশীলের শ্রাদ্ধ।

মৃত্যুর আগেরদিন ডা. সুরেশ সুশীলের বাড়িতে হামলা করেছিল একদল দুর্বৃত্ত!
মৃত ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের স্ত্রী মৃণালিনী বালা সুশীল মানু বলেন, ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যার দিকে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সাথে আমার ছেলে চম্পক ও প্লাবনের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। পরে অনুপম সুশীল এসে তাদের মধ্যে সমঝোতা করে দেয়। কিন্তু এই সমঝোতাও মানেনি ওই যুবকরা। ওইদিন রাতে ২০-৩০ জন যুবক এসে বাড়িতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। ঘরের টিনের তৈরি বেড়াও ভেঙ্গে দেয়।

কিন্তু কারা সেই যুবক তাদের নাম প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমাদের হুমকি দেয়া হয়েছিল এলাকা ছেড়ে চলে যেতে। এজন্য আমরা অনেকটা আতংকের মধ্যে দিন কাটিয়েছি।

এই ঘটনার সাথে গাড়িতে চাপা পড়ে সন্তানদের মৃত্যুতে কোন ষড়যন্ত্র আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তা বুঝতে পারছি না। তবে আমার সন্তানদের যারা হত্যা করেছে আমি তাদের সঠিক বিচার দাবি করছি।

তিন ছেলে-মেয়ে ‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে’, ছোট ভাইকে করতে হলো সুরেশ সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্টান

মামলা করলেন কে?

মালুমঘাট হাইওয়ে থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ পরিদর্শক শাফায়েত হোসেন বলেন, ঘাতক পিকআপটি জব্দ করা হয়েছে। ওই গাড়ির চালক-হেলপারকে ধরতে সোর্স লাগানো হয়েছে। এ ঘটনায় একটি মামলাও হয়েছে। নিহতের ছোট ভাই প্লাবন সুশীল বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামী দেখিয়ে চকরিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

তবে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে নিহতদের কাকা (চাচা) চিত্ত রঞ্জন সুশীল বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে এখনও থানায় কোন এজাহার দিইনি। আমার দুই ভাইপো ও এক ভাতিজী হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে। মামলার বিষয়ে আমরা অবগত না। এমনকি যাকে বাদী বলা হচ্ছে সেই প্লাবন সুশীলও জানেন না মামলার বিষয়ে।

শোক ও শাস্তির দাবি
এদিকে বুধবার দুপুরে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানান চকরিয়া-পেকুয়া (কক্সবাজার-০১) আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেপি দেওয়ান, ডুলাহাজারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদর।

এ সময় চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউএনও জেপি দেওয়ান মৃত প্রত্যেকের ওয়ারিশকে ২৫ হাজার টাকা করে ১ লাখ ২৫ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দিয়েছেন।

তিন ছেলে-মেয়ে ‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে’, ছোট ভাইকে করতে হলো সুরেশ সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্টান

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেপি দেওয়ান বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে। আর ওই পিকআপের চালক-হেলপারকে আটক করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে।

এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন কক্সবাজার জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট দীপংকর বড়ুয়া পিন্টু, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক প্রিয়তোষ শর্মা চন্দন, জেলা পূজা উপদযাপন পরিষদের সভাপতি উজ্জল কর, সাধারণ সম্পাদক বেন্টু দাশ, চকরিয়া উপজেলা ও পৌরসভা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, চকরিয়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদ।

তারা এটি কী নিছক দূর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড- তা গভীর ভাবে খতিয়ে দেখার জন্য প্রশাসনের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।

এই পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ