একটি ‘বিতর্কিত’ নির্বাচন কমিশন ও তার আমলনামা!

একটি ‘বিতর্কিত’ নির্বাচন কমিশন ও তার আমলনামা!

ডেস্ক রিপোর্ট
বিসিবিনিউজ ‍টুয়েন্টিফোর ডটকম

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে পথচলা শুরু হয়েছিল কে এম নূরুল হুদা কমিশনের। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ‘রাতের ভোট’ শব্দটির সঙ্গে দেশের মানুষ পরিচিত হয়। এরপর একের পর এক নির্বাচন হয়েছে আর ব্যর্থতার ঝুলি পূর্ণ করেছে এই কমিশন। মেয়াদ শেষে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিচ্ছে হুদা কমিশন।

নানা সময়ে বিরোধী দল, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের সমালোচনার মুখে থাকা এই কমিশনের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ- তারা নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে খাদের কিনারে রেখে যাচ্ছে।

সময়ে সময়ে অভিযোগ আসলেও সিইসিসহ অন্য তিন কমিশনার নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন বরাবরই। ব্যতিক্রম ছিলেন একমাত্র কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তিনি সময়ে সময়ে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেছেন। নোট অব ডিসেন্ট জমা দিয়েছেন। তার ভাষায় এটি ছিল তার গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ।

তিনি এও বলেছেন, ৫ জনের কমিশনে একা লড়ে কোনো লাভ নেই। যা হওয়ার তাই হয়। একজনের বাধায় এখানে কোনো কিছু আটকে থাকে না। বাকি চারজন এক হলে যেকোনো কাজ অনায়াসেই করে ফেলা যায়।

হুদা কমিশন তাই করেছে। মাহবুব তালুকদার কেবল কথা বলে গেছেন। তার কোনো কথাই আমলে নেয়া হয়নি।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কমিশন চাইলে ভালো নির্বাচন করতে পারতো। কিন্তু তাদের সেই মানসিকতা ছিল না। যদিও বিদায়ী সময়ে সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, তাদের কিছু ভুলত্রুটি ছিল। কিন্তু কমিশন সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। সব নির্বাচন তারা যথাসময়ে সম্পন্ন করে যেতে পেরেছেন।

এই কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের শুরুটাই বড় বিতর্ক দিয়ে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সারাদেশে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট দিয়েছেন। এসব কেন্দ্রে মৃত মানুষের ভোটও পড়েছে। ১ হাজার ১৭৭টি কেন্দ্রে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা শূন্য ভোট পেয়েছেন। ২টি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে কোনো ভোট পড়েনি। এছাড়া ৫৯০টি কেন্দ্রে বৈধ ভোটের সবগুলোই মাত্র একটি প্রতীকে পড়েছে।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ফলাফল কোনোভাবেই সুষ্ঠু ভোটের চিহ্ন বহন করে না। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতেও এই রাতের ভোটের ধারাবাহিকতা ছিল লক্ষণীয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি নির্বাচনে নূরুল হুদা কমিশনের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সবশেষ ৮ ধাপে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের কোনো দায় নেই বলে সাফ জানিয়ে দেন সিইসি কেএম নূরুল হুদা।

অতীতেও ইসি’র বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক নির্বাচন আয়োজন ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না করার অভিযোগ থাকলেও নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না। কিন্তু নূরুল হুদা কমিশন ছিল এর ব্যতিক্রম। এই কমিশনের বিরুদ্ধে নির্বাচন-সংক্রান্ত গুরুতর অসদাচরণের পাশাপাশি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। এসব অনিয়মের অভিযোগ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নিতে প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠি দিয়েছেন দেশের ৪২ বিশিষ্ট নাগরিক।

‘বিতর্কিত’ ১৫টি পদ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, অন্য চারজন কমিশনার, সচিব, ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকসহ কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে অন্যায় ও অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দেয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয় নাগরিকদের পক্ষ থেকে। ২০১৮-১৯ সালে অল্প কিছু কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ বাজেট থেকে ১১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়। এরমধ্যে অন্তত সাড়ে তিন কোটি টাকা নিয়েছেন সিইসিসহ ও অন্য চার কমিশনার, নির্বাচন কমিশনের সচিব, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের প্রধানসহ মাত্র ১৮ জন কর্মকর্তা।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যে কমিশনের বর্তমান সচিবও এমন অর্থ ভাগাভাগি করে নেয়ার নীতিগত দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কমিশনের নেতৃত্বে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারাও। দুর্নীতির অনুশীলন গড়িয়েছে মাঠ পর্যন্তও। রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ এসেছে। সিলমারা ব্যালটসহ কেন্দ্রের বাইরে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন সিলেটের একজন থানা নির্বাচন অফিসার। বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন তিনি। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে টাকার বিনিময়ে প্রার্থীদের জিতিয়ে দেয়ার অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। ইউপি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

নূরুল হুদা কমিশন অসততার যেসব উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তার অন্যতম হলো ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহারের ব্যাপারে কমিশনের অঙ্গীকার রক্ষা না করা। সিইসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নূরুল হুদা একাধিকবার প্রকাশ্য অঙ্গীকার করেছিলেন যে রাজনৈতিক দলগুলো একমত না হলে কমিশন ভবিষ্যতে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করবে না। সব বিরোধী দলের অসম্মতি সত্ত্বেও কমিশন সব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। শুধু তাই নয়, কমিশন ভিভিপিএটি (ভেরিফায়েভল ভোটার পেপার অডিট ট্রেইল) ছাড়াই প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এবং কমিশন কর্তৃক গঠিত কারিগরি কমিটির উপদেষ্টা অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর মতামত উপেক্ষা করে দেড় লাখ ইভিএম ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। অধিকাংশ স্টেকহোল্ডারের প্রতিবাদ আমলে না নিয়ে এই ত্রুটিপূর্ণ ইভিএম ব্যবহার চালিয়ে যায় নূরুল হুদা কমিশন। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শতভাগ কেন্দ্রে ইভিএমের ব্যবহার হয়। ইভিএমের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে স্বল্প সময়ে ভোটের ফল প্রকাশের কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি কারিগরি ত্রুটির কারণে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ বছরের মেয়াদকালে বর্তমান ইসির পক্ষপাতদুষ্টতার বড় দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে গত জাতীয় নির্বাচনে। বিরোধী দলের ওপর সরকারের দমনপীড়ন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মদতে গত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বিরোধী দলের প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার থেকে বিরত রাখা এবং ভোটের ক্ষেত্রে অনিয়ম কারসাজি-জবরদস্তির বিষয়ে কমিশন ছিল নির্বিকার। বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন ছাড়াও ব্যক্তিগত আক্রমণ ও আক্রোশমূলক বক্তব্য প্রদানেরও অভিযোগ রয়েছে সিইসি কেএম নূরুল হুদার বিরুদ্ধে। সহকর্মী নির্বাচন কমিশনারদেরও ছেড়ে দেননি সিইসি হুদা।

নির্বাচনী অনিয়ম নিয়ে কমিশনে একমাত্র সরব ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। প্রতিটি নির্বাচনের পর সংবাদমাধ্যমে আত্মসমালোচনা করেছেন তিনি। এতে করে পক্ষান্তরে কমিশনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেন মাহবুব তালুকদার। কিন্তু সহকর্মীর এমন কর্মকাণ্ডে তিনি একসময় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। মাহবুব তালুকদারকে কটাক্ষ করে নানা মন্তব্য করেন গণমাধ্যমে। এমনকি ক্যান্সার আক্রান্ত মাহবুব তালুকদারের চিকিৎসা ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। যদিও কমিশন থেকে সকল কমিশনারই তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন।

বিশিষ্ট নাগরিকদের বিরুদ্ধেও বিষোদ্গার করেন সিইসি হুদা। সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই কমিশন থেকে সুবিধা নেয়ার অপচেষ্টার অভিযোগ তোলেন তিনি। পরবর্তীতে ড. মজুমদার তথ্য-প্রমাণ চ্যালেঞ্জ করলে সিইসি হুদা কোনো জবাব দেননি।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ
ওদিকে মেয়াদের শেষে রোববার প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে বিদায়ী নির্বাচন কমিশন। সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম ও কবিতা খানম বঙ্গভবনে যান। সাক্ষাৎকালে তারা কমিশনের নির্বাচনী কার্যক্রমসহ তাদের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রেসিডেন্টকে অবহিত করেন। তারা দায়িত্ব পালনে প্রেসিডেন্টের সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ ও জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন ২০২১ এর বাংলা পাঠ প্রেসিডেন্টকে হস্তান্তর করেন। এ ছাড়া প্রেসিডেন্টকে বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্বলিত জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়।

এ সময় প্রেসিডেন্ট বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দল ও জনগণের সহযোগিতা অপরিহার্য। তাই নির্বাচন কমিশনকে নির্বাহী বিভাগ, রাজনৈতিক দল ও জনসাধারণের সহযোগিতা নিয়ে এই কাজটি সম্পন্ন করতে হবে।

প্রেসিডেন্ট আশা প্রকাশ করেন ভবিষ্যতে সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণের সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশন স্থানীয় পর্যায়সহ সকল নির্বাচন আরও সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠানে সক্ষম হবে।

প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সচিব সম্পদ বড়ুয়া, সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম সালাহ উদ্দিন ইসলাম, প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন, সচিব (সংযুক্ত) মো. ওয়াহিদুল ইসলাম খান এবং নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সুত্র : মানবজমিন

এই পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ