সবপথের গন্তব্য স্মৃতির সেই মিনারে

সবপথের গন্তব্য স্মৃতির সেই মিনারে

ডেস্ক রিপোর্ট
বিসিবিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

‘প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী আমায় নেবে সঙ্গে/বাংলা আমার বচন, আমি জন্মেছি এই বঙ্গে।’- প্রাণের ভাষা বাংলার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের স্মরণে উৎসারিত কবি আল মাহমুদের এই পঙ্‌ক্তির সঙ্গে মিশে আছে প্রত্যেক বাঙালিরই অনুভূতি। তাই প্রতিবছরের মতো এবারও সারাদেশে নেমেছে প্রভাতফেরির ঢল, সব রাজপথ গিয়ে মিশেছে আজ শহীদ মিনারে। পলাশ, শিমুল ফোটা ফাগুনের মিষ্টিমাখা হালকা শীতের ভোরে দেশের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে তাদের পূর্বসূরি সেসকল বাঙালি বীর সন্তানকে, যারা নিশ্চিত করে গেছেন মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার। নগ্নপায়ে শহীদ মিনারমুখী লাখো মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হবে বিষাদমাখা চিরচেনা সেই গান- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি।’

চির প্রেরণার অমর একুশের ৭০ বছরপূর্তি হচ্ছে আজ। ১৯৪৮ সালে গড়ে ওঠা ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের বক্তব্যের জের ধরে। ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে তিনি ঘোষণা দেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। যার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শুরু হয় দুর্বার আন্দোলন।

একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে আন্দোলনকারী ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে সমবেত হন এবং পুরোনা কলাভবন প্রাঙ্গণের আমতলায় ছাত্রসভার পর ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে রাজপথে নামতে শুরু করেন। পুলিশ এ সময় কাঁদানে গ্যাস ও গুলিবর্ষণ করতে থাকে। ছাত্ররা আইনসভায় গিয়ে দাবি উত্থাপনের লক্ষ্যে রওনা হলে পুলিশের গুলিবর্ষণে রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার, আবুল বরকত, অহিউল্লাহ প্রমুখ শহীদ হন। আহত ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সচিবালয়ের পিয়ন আবদুস সালাম। ওই ঘটনার প্রতিবাদ, নিহতদের জানাজা ও শোক মিছিলের সময় পুলিশ ও মিলিটারি আবারও হামলা চালায়। এতে শফিউর রহমানসহ কয়েকজন নিহত হন এবং অনেকে আহত ও গ্রেপ্তার হন।

সন্ধ্যার দিকে এ খবর রাজশাহীতে গিয়ে পৌঁছলে সেখানকার আন্দোলনকারীরা সেদিন রাতেই রাজশাহী কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার গড়ে তোলেন। তবে পরদিন তারা পিকেটিংয়ে বের হলে পুলিশ এসে এই শহীদ মিনার ভেঙে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের স্মরণে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। যা পুলিশ ২৬ ফেব্রুয়ারি ভেঙে ফেলে। তবে ভাষাশহীদদের স্মরণে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি পালন অব্যাহত থাকে। ১৯৬৩ সালে শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ শেষ হয়।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সবপথের গন্তব্য স্মৃতির সেই মিনারে

শহীদ মিনারে ছোট্ট শিশুর শ্রদ্ধা

বর্ণাঢ্য নানা আয়োজন
এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় আজ ‘শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপনের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ অবদানের বিষয়টি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

দিবসটি উপলক্ষে আজ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সংগতি রেখে বর্তমান কভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনায় যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করবে। আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ, কোরআনখানিসহ দেশের সব উপাসনালয়ে ভাষা শহীদদের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করা হবে।

বর্তমান কভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে প্রতিটি সংগঠনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচজন প্রতিনিধি হিসেবে ও ব্যক্তি পর্যায়ে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দু’জন শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে পারবেন। শহীদ মিনারের সব প্রবেশমুখে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন ও লিকুইড সাবান রাখা হবে। মাস্ক পরা ছাড়া কাউকে শহীদ মিনার চত্বরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। গণমাধ্যমে আজ প্রচারিত হবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা, সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সড়কদ্বীপ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আলোকসজ্জিত করা হবে। আজ সরকারি ছুটির দিন।

বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলো শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, চিত্র প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করবে। গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ঢাকা মহানগরীতে ট্রাকে করে ভ্রাম্যমাণ সংগীতানুষ্ঠান এবং নৌযানের সাহায্যে ঢাকা শহর সংলগ্ন নৌপথে সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজনসহ জেলা-উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র প্রদর্শন করবে।

কর্মসূচি: রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও সারাদেশের শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। গত রাত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্যদিয়ে একুশের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এছাড়া কালোব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা জানানো হবে।

এই পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ