৯ মিনিটেই শেষ জিয়া হত্যা মিশন

৯ মিনিটেই শেষ জিয়া হত্যা মিশন

ডেস্ক রিপোর্ট
বিসিবিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

মনজুর তাঁর দল নিয়ে হাঁটছেন। গ্রামের কয়েকটা বাচ্চা ছেলে তাদের কিছুটা এগিয়ে দিল। যাওয়ার সময় তারা টাকা চাইল। মনজুর তাদের ৫০ টাকা দিলেন। তারপর আবার হাঁটা। তাদের সঙ্গী গ্রামের আরেকটি লোক। বাচ্চাগুলো টাকা নিয়ে সোজা চলে গেছে থানায়। সেখানে গিয়ে বলছে, এ রকম কয়েকটা লোক যাচ্ছে। তাদের টাকা দিয়েছে।

রেডিওতে বারবার ঘোষণা হচ্ছে- মেজর জেনারেল মনজুরকে জীবিত বা মৃত ধরতে পারলে পাঁচ লাখ টাকা এবং মেজর মোজাফফর ও মেজর খালেদকে ধরিয়ে দিতে পারলে তিন লাখ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে।

রেজা বুকপকেটের ওপর থেকে নেমপ্লেট খুলে পকেটে রাখলেন। মনজুর নেমপ্লেটটি খোলেননি। সবারই খিদে পেয়েছে। সঙ্গের লোকটি তাঁদের এক জায়গায় বসিয়ে একটা কাঁঠাল খাওয়ালেন। রানা মনজুর বললেন, মনজুর, তুমি ইন্ডিয়ার সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিলে কেন? এখন তো ইন্ডিয়া তোমাকে শেল্টার দেবে না।

ওরা বলে আমি নাকি ইন্ডিয়ার দালাল! অ্যাম আই অ্যান ইন্ডিয়ান এজেন্ট? আই অ্যাম নট অ্যান ইন্ডিয়ান এজেন্ট। আই অ্যাম আ প্যাট্রিয়ট।

তাঁরা হাঁটছেন। সঙ্গে দুজন স্থানীয় লোক। তাঁরা এক জায়গায় থামলেন।

মনজুর তাদের খাবার কেনার জন্য টাকা দিলেন- কলা, মুড়ি, যা পাওয়া যায়। লোক দুজন চলে যাওয়ার জন্য তৈরি।

কাছেই ছিলেন প্রবীণ এক ব্যক্তি। তিনি বললেন, ওরা তো দুষ্ট লোক, টাকা নিয়ে ভেগে যাবে।

রেজা লোক দুজনকে ডেকে বললেন, ঠিক আছে, কিছু আনতে হবে না।

আপনি আমাদের সন্দেহ করেন? ঠিক আছে, আপনাদের টাকা ফেরত নেন।

মনজুর বললেন, না না, তোমরা যাও, খাবার নিয়ে আসো। কিছুক্ষণ পর ওরা মুড়ি আর কলা নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ফিরল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, তাড়াতাড়ি চলেন।

কী হয়েছে?

আর্মি নাইমা পড়ছে। দুইটা লোককে বাইন্ধা নিয়া যাইতেছে। তাদের চোখ বান্ধা। তাড়াতাড়ি ভাগেন।

মনজুর আর রেজার বুঝতে বাকি রইল না, কর্নেল ফজলে হোসেন আর ক্যাপ্টেন জামিল ধরা পড়েছেন। আবার হাঁটা। লোক দুজন তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে চলছে। বেশ কিছু দূর গিয়ে তারা থামলেন। সামনে একটা পাহাড়ের ঢাল। সেখানে চা-বাগানের এক কুলির কুঁড়েঘর। লোক দুজন বলল, এখন আর যাওয়া যাবে না। এখানেই বিশ্রাম নেন। আমরা কাছাকাছি আছি। রাত হলে আবার রওনা দেব।

লোক দুজনকে আরও টাকা দিলেন মনজুর। খাবার জোগাড় করতে হবে, রান্না হবে।

কুলি তার ঘরে যা আছে তাই খেতে দিল। সবাই কিছু কিছু খেল। রেজার ঘুম নেই দুরাত। তিনি কিছুই খেলেন না।

মাটির ঘর। সামনে বারান্দা। রেজা সেখানে স্টেনগান হাতে নিয়ে বসে থাকলেন। লোক দুজন বলল, স্যার, আপনার জুতা ভিজে গেছে। জুতা খুলে একটু আরাম করেন। আর আপনার আর্মসটা আমার কাছে রাখেন।

সাবধান, কাছে আসবে না।

আচ্ছা স্যার, ঠিক আছে ।

সময় পেরিয়ে যায়। একেকটা মিনিট মনে হয় অনন্তকাল। হঠাৎ কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ। একটু অস্বাভাবিক মনে হলো। ঘরের ভেতর থেকে মনজুরের গলা শোনা গেল, রেজা, কুকুর ঘেউ ঘেউ করে কেন?

জানি না, স্যার।

ভেতরে আসো।

মনজুর আর রেজা ঢাল বেয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠলেন। এরপর আবার ঢাল। তার ওপরে আরেকটা পাহাড়। দূর থেকে আবছা দেখা যায়, কিছু লোক এদিকে তাকিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। পরনে খাকি পোশাক। রেজা বুঝতে পারলেন, এরা পুলিশের লোক এবং তাদের টার্গেট জানা আছে।

যে দুজন লোক তাঁদের এখানে নিয়ে এসেছিল, তারা কিছু দূর গিয়েই পুলিশের দেখা পেয়েছে। পুলিশকে তারা বলেছে যে- এখানে তিনজন লোক পরিবার নিয়ে পালিয়ে এসেছে।

মনজুর রেজার উদ্দেশে বললেন, ওরা মনে হয় পুলিশের লোক। ঠিক আছে, আমি সারেন্ডার করব।

রানা মনজুর বললেন, মনজুর, তুমি রেজা ভাই আর গিয়াস ভাইকে নিয়ে পালাও। আমরা ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে যতক্ষণ পারি আটকে রাখব।

তোমরা তিনজন পালাও।

মনজুর বললেন, নো, আমরা পালাব না।

মেজর গিয়াস বললেন, রেজা, তুমি যাবে?

না স্যার, আমি যাব না। জেনারেল মনজুরের দায়িত্ব আমার। উনি যদি না যান, আমি যাব না। উনি সারেন্ডার করলে আমিও সারেন্ডার করব। উনি পালালে আমিও পালাব।

তুমি থাকো। আমি যাই। মেজর গিয়াস চলে গেলেন।

তাহলে রেজা মনজুরের উদ্দেশে বললেন, স্যার, পুলিশ আসুক। আমরা ওদের বিহ্যাভিয়ার দেখব। যদি খারাপ দেখি, তাহলে গুলি করব। যদি ভালো দেখি, তাহলে সারেন্ডার করব।

পাহাড়ের পেছনে একটা ঝোপ। পাশ দিয়ে জলের একটা ধারা চলে গেছে। পাহাড়ি ঝিরি। মনজুর সেখানে বসলেন। তাঁর হাতে একটা পিস্তল। রেজা আচমকা পাহাড়ের ওপর থেকে লাফ দিলেন। পড়লেন ঝিরির জলে। ডুবসাঁতার দিয়ে কিছু দূর গিয়ে মাথা তুললেন। সেখানে কোমরসমান পানি। আশপাশে ঝোপঝাড়। তাঁকে ধরতে হলে ঝোপঝাড় ভেঙে পানির মধ্যে আসতে হবে।

পানির মধ্যে হেঁটে হেঁটে রেজা ঝিরির কিনারায় এলেন। স্টেনগানের নলে পানি ঢুকেছে। ঝাঁকি দিয়ে পানি ঝাড়লেন। কক করে একটা গুলি ফেলে দিলেন। তারপর পজিশন নিলেন। এমনভাবে বসলেন, যেন বিপদ এলে গুলি করতে পারেন।

ওপরে লতা-পাতায় খসখস শব্দ হচ্ছে। জেনারেল মনজুরের গলা শোনা যাচ্ছে। চেঁচিয়ে বলছেন, এই যে বাবারা, তোমরা সামনে আসিবে না। সামনে আসিলে অসুবিধা হইবে। আমি আসিতেছি।

রেজাকে মনজুর আগেই বলেছিলেন, তিনি সারেন্ডার করবেন। ‘উই শ্যাল নট ফায়ার আ সিঙ্গেল বুলেট।

মনজুর গুলি করতে চাননি। পুলিশ গুলি করুক এটাও তিনি চাননি। একটু সামনে গিয়ে মনজুর দেখলেন, কয়েজন পুলিশের লোক। তিনি সারেন্ডার করলেন।

রেজা কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছেন না। ঝোপের আড়ালে থাকায় কিছুই দেখছেন না। একটু ওপরে উঠে দেখলেন, জেনারেল মনজুর একটা গাছে হেলান দিয়ে বসে আছেন, সিগারেট খাচ্ছেন। তাঁর দুটি বাচ্চা মাঠের ওপর বসে ঘাস ছিঁড়ছে। পুলিশ চেঁচিয়ে বলছে, ভাই, আপনি কোথায় আছেন? আপনার কমান্ডার সারেন্ডার করছে। আসেন।

রেজা আরেকটু সামনে গিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে বললেন, এই যে।

পুলিশ রেজাকে দেখেছে। কিন্তু সামনে এগোচ্ছে না। হ্যান্ডস আপ বলছে না।

এই যে গেরাই, আসেন।

সামরিক বাহিনীতে গেরাই শব্দটি চালু আছে। এর মানে হলো ‘দেশি’, অর্থাৎ আপনজন।

রেজা স্টেনগানটা আস্তে করে মাটিতে রাখলেন। পুলিশ এগিয়ে এলো। তাঁকে দেখে বলল, আপনি কি মেজর খালেদ?

না।

আপনি কি মেজর মোজাফ্ফর?

না।

আপনি কে?

আমি মেজর রেজা।

স্যার স্যার স্যার! আপনার কাছে অস্ত্র আছে?

আমার স্যার সারেন্ডার করেছেন। আমিও সারেন্ডার করব। আমি যদি চাইতাম, আগেই আপনাদের গুলি করতে পারতাম। আমি সেটা করি নাই। এই যে আমার অস্ত্র। এটা নিয়া যান।

না স্যার, না স্যার, আপনি আসেন।

মনজুর এসব খেয়াল করেননি। তিনি আপনমনে সিগারেট খেয়ে চলেছেন। কাছেই বসে থাকা মেয়েটা বলে উঠল, পাপা, দেখো, রেজা আঙ্কেল সারেন্ডার করেছে।

মনজুর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন। বললেন, রেজা, হোয়াই হ্যাভ ইউ সারেন্ডারড মাই বয়? ওরা তো আমাকে মেরেই ফেলবে। তোমরা যদি
একে একে সবাই সারেন্ডার করো, তাহলে আমার কথা দেশবাসীকে কে বলবে?

স্যার, আপনার মতো একজন ভেটারান ফ্রিডম ফাইটার বীর উত্তমকে যদি ওরা মেরে ফেলে, তাহলে আমার মতো ক্ষুদ্র একটা লোকের মরতে আপত্তি নাই। আই ওয়ান্ট টু ডাই উইথ ইউ।

ও মাই কমরেড!

এ কথা বলেই মনজুর জড়িয়ে ধরলেন রেজাকে। হাত থেকে সিগারেটটা রেজার ঠোঁটে চেপে ধরে বললেন, স্মোক দিস।

দুই টান দিয়ে রেজা সিগারেটা ফেলে দিলেন।

যে কয়েকজন পুলিশ এসেছিল, তাদের নেতৃত্বে ছিল একজন হাবিলদার। তাদের ঊর্ধ্বতন অফিসার রয়ে গেছেন তিন কিলোমিটার দূরে।
মনজুর তাদের বললেন, আর দেরি কেন? চলো আমরা যাই।

সবাই নিচে নামলেন। হেঁটে হেঁটে গেলেন কিছু দূর। সামনে অপেক্ষমাণ সার্কেল ইন্সপেক্টর মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস। হাবিলদারকে উদ্দেশ করে রেজা বললেন, হাবিলদার সাহেব, রাস্তায় কোনো থামাথামি নাই। মুভ।

রেজা আশঙ্কা করছেন, পথে তাঁদের থামিয়ে কেউ গুলি করে মেরে ফেলতে পারে।

সিআই কুদ্দুস সবাইকে গাড়িতে তুললেন। গাড়িবহর রওনা হলো। কিছু দূর যেতেই দেখা গেল, রাস্তার দুপাশে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর খবর শুনে অনেকেই উত্তেজিত। রেজা প্রমাদ শুনলেন, হাবিলদার সাহেব, এদের ধমকে দেন। কেউ যেন গাড়ির ধারে-কাছে না আসে। কেউ কাছে আসলে আমি কিন্তু আপনার অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ওদের গুলি করব।

হাবিলদার চেঁচিয়ে বললেন, সবাই সরে যাও। কেউ কাছে আসবে না।

রেজার মনে হলো, মানুষের একটা ভিড় বানিয়ে তাদের মধ্যে ওদের ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। পরে গল্প বানাবে- উন্মত্ত জনতার পিটুনিতে পলাতক সেনা কর্মকর্তা নিহত। আশপাশে অনেক লোক। সবাই স্লোগান দিচ্ছে- জিয়া হত্যার বিচার চাই, খুনি মনজুরের ফাঁসি চাই।

পথে আর কোনো ঝামেলা হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িবহর ঢুকল হাটহাজারী থানার গেটের ভেতরে। সবাইকে নিয়ে সিআই কুদ্দুস ঢুকলেন ওসির কামরায়। বন্দিদের বসানো হলো। তাঁদের কোল্ড ড্রিংক আর ডানহিল সিগারেট দেয়া হলো। মনজুরের বড় মেয়েটা চিৎকার করে বলল, আপনারা সব রাজাকার। রাজাকার না হলে আমার বাবাকে কেন ধরে আনলেন?

রেজা পুলিশকে লক্ষ্য করে বললেন, রাগ করবেন না। বাচ্চা মেয়ে। এত বড় একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। ওর তো খারাপ লাগবেই।

এ সময় ওসির কামরায় ঢুকলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এএইচএস শাহজাহান। তিনি মনজুরের পরিচিত। চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি মিটিংয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা ও কথা হয়েছে। মনজুর তাঁকে বললেন, কয়েকজন সাংবাদিককে ডাকুন। আমার কিছু বলার আছে।

ডিআইজি সাহেব বললেন, সেটা সম্ভব নয়।

তাহলে তাড়াতাড়ি আমাকে চিটাগাং জেলে নিয়ে যান। শাহজাহান সাহেব, প্রেসিডেন্ট অব দ্য কান্ট্রি হ্যাজ বিন অ্যাসাসিনেটেড, অ্যান্ড আই অ্যাম ব্লেইমড। সো আই শুড গেট অ্যান অপরচুনিটি টু ফেস দ্য ট্রায়াল। আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিন।

ঠিক আছে।

আমি যার কাছে সারেন্ডার করেছি, তাকে একটু ডাকেন তো?

সিআই কুদ্দুস ঢুকলেন। নো নো। হি ওয়াজ নট দেয়ার। তাকে তো আমি দেখিই নাই।

দিচ্ছে। মুখে দাড়ি। রেজা বললেন, স্যার, ওই যে হাবিলদার। তাকে আসতে ওসির কামরার দরজাটা ভেড়ানো। দরজার ফাঁক দিয়ে একটা মুখ উঁকি দিচ্ছে।

শাহজাহান হাবিলদারকে কাছে আসতে বললেন। হাবিলদার এলেন। মনজুর বললেন, হাবিলদার সাহেব, এদিকে আসেন।

মনজুর কোমর থেকে পিস্তল বের করলেন। হাবিলদার লাফ দিয়ে পিছিয়ে গেল।

মনজুর বললেন, ঘাবড়াবেন না। আমি এতক্ষণ আমার পিস্তল সারেন্ডার করিনি। আমি আপনাদের বিহ্যাভিয়ার দেখছিলাম। যদি খারাপ কিছু দেখতাম, পিস্তলটা ব্যবহার করতাম। এখন মনে হচ্ছে আমরা নিরাপদ। শাহজাহান সাহেব এসে গেছেন। এখন আমি আনুষ্ঠানিকভাবে পিস্তলটা হ্যান্ডওভার করতে চাই। যার কাছে সারেন্ডার করেছিলাম, তার কাছে।

ঘরের মধ্যে একটা নাটকীয় পরিবেশ তৈরি হলো। হাবিলদার এগিয়ে এলেন। মনজুর পিস্তলটা হাবিলদারের হাতে দিয়ে বললেন, শাহজাহান সাহেব, আমি সারেন্ডার করেছি এই হাবিলদারের কাছে। আমার নামে বরাদ্দ হওয়া পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কারের একমাত্র হকদার সে। আর কেউ না। আমি আনুষ্ঠানিকভাবে তার কাছে আমার পিস্তল দিলাম। আপনি সাক্ষী থাকলেন।

থানার সামনে পুলিশের একটা ট্রাক। সবাইকে ট্রাকে তোলা হলো। কিন্তু ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যে থানায় এসে ঢুকল আর্মির একটা জিপ।

রেজা খারাপ কিছু আশঙ্কা করলেন। মনজুরের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত। ট্রাকে রেজা বসেছেন এক ধারে। তাঁর পেছনে মিসেস মনজুর। তাঁর পেছনে মনজুর। হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হয়ে গেলে মনজুর যেন একটু আড়াল পান, সে জন্য এভাবে বসা। মনজুর জিজ্ঞেস করলেন, শাহজাহান সাহেব কোথায়?

কয়েকবার ডাকলেন। শাহজাহান সাহেব আর আসেন না।

সেনাবাহিনীর একটি দল নিয়ে হাটহাজারী থানায় এসেছেন ক্যাপ্টেন এমদাদ হোসেন। সরাসরি ঢুকলেন ওসির কামরায়। ডিআইজি শাহজাহান এবং সিআই কুদ্দুস তখনো সেখানে বসা। এমদাদ মনজুরকে তাঁর জিম্মায় নিতে চাইলেন। শাহজাহান সাহেব রাজি নন। বললেন, তিনি তো সারেন্ডার করেছেন পুলিশের কাছে। কোন যুক্তিতে তাঁকে আপনার কাছে দেব? আগে তাঁকে জেলখানায় নিই। তারপর যা করার আপনারা করবেন।

ঢাকা থেকে বারবার ফোন আসছে শাহজাহানের কাছে, মনজুরকে যেন সেনাবাহিনীর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। শাহজাহান ক্যাপ্টেন এমদাদকে বললেন, ঠিক আছে। তবে আমাকে লিখিত দিতে হবে যে তাঁকে আপনি আমার কাছ থেকে নিয়েছেন।

ক্যাপ্টেন এমদাদ ওসির টেবিল থেকে একটা সাদা কাগজ নিয়ে খসখস করে লিখলেন, আমি মো. এমদাদ হোসেন (ক্যাপ্টেন), চিটাগাং ক্যান্টনমেন্ট, অদ্য ১/৬/৮১ইং রাত ৯টা ৩৫ মিনিটের সময় হাটহাজারী থানা হইতে নিম্নলিখিত আর্মি অফিসার ও পরিবারবর্গদেরকে বুঝিয়া পাইলাম।

আমি তাহাদিগকে চিটাগাং ক্যান্টনমেন্টে লইয়া যাইবো। ব্রিগেডিয়ার আজিজ (ইবিআরসি) ও ব্রিগেডিয়ার লতিফ (কমান্ডার ২০৩ ব্রিগেড)-এর আদেশমতে তাহাদিগকে লইয়া যাইতেছি।

১. মেজর জেনারেল এম এ মনজুর।
২. মেজর রেজাউল করিম।
৩. মিসেস এম এ মনজুর।
৪. মিসেস লে. ক. দেলোয়ার হোসেন।
৫. জেনারেল সাহেবের দুই ছেলে দুই মেয়ে।
৬. লে. ক. দেলোয়ার সাহেবের তিন মেয়ে।

উপরোক্ত ব্যক্তিদের নিজস্ব মালামাল তাহাদের নিজের সঙ্গেই আছে। উপরোক্ত ব্যক্তিদের স্বীকার অনুযায়ী পুলিশের নিকট কোনো মালামাল রইল না। কেবলমাত্র একটা ৭৬২ এমএম এসএমজি এবং একটি পিস্তল পুলিশের নিকট রইল।
ক্যাপ্টেন মো. এমদাদ হোসেন।

এমদাদ ওসির কামরা থেকে বেরিয়ে অপেক্ষমাণ ট্রাকের কাছে এলেন।

ডিআইজি শাহজাহান বের হলেন না। মিসেস মনজুরকে উদ্দেশ করে এমদাদ বললেন, ভাবি, আসেন। আপনাদের নিতে এসেছি।

নিতে এসেছি মানে? আমরা সারেন্ডার করেছি পুলিশের কাছে। আমরা জেলে যাব। আপনার সঙ্গে যাব কেন?

এমদাদ ট্রাকের গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। মনজুর গর্জে উঠলেন, হু ইজ দ্যাট অফিসার?

এমদাদ পেছন দিকে সরে গেলেন। মনজুর ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, তোমাদের লজ্জা করে না? তিন বছর সব উজাড় করে তোমাদের জন্য কী না করেছি। তোমরাই সব ঘটনা ঘটালে। আবার তোমরাই এসেছ আমাকে ধরে নিতে? যাও, আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না।

এমদাদ পিছু হটে একজন সুবেদারের সঙ্গে কথা বললেন। সুবেদার এগিয়ে এসে হেঁড়ে গলায় বলল, আপনি আসেন।

যাও, যাব না।

সুবেদার লরির পা-দানিতে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে মনজুরের শার্টের কলার ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। মনজুর লরির বাইরে ছিটকে মাটিতে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে সুবেদার তাঁর হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে ফেলল। একটা কাপড় দিয়ে চোখও বেঁধে ফেলল। মনজুর নির্বাক। একটা শব্দও করেননি।

কুদ্দুস এগিয়ে এসে বললেন, এই যে মেজর সাহেব।

রেজা তখন শার্টের বোতাম খুলছেন। ভাবছেন, লাফিয়ে নেমে দৌড়ে পালাবেন।

এমদাদ বললেন, দোস্ত, আয়া পড়।

এসব কী করতেছস? তুই এইটা কী করলি? আগে আমারে নামাইতি? আমিই না হয় জিওসিরে নামাইতে সাহায্য করতাম? একটু বুঝায়া বলতাম? এ ধরনের আচরণ তো ঠিক হইল না।

দোস্ত, তুমি সিচুয়েশন বুঝতেছ না। কোনো কথা কইবা না। আমরা যা করি, তাতে বাধা দিবা না। হ্যাভ কনফিডেন্স অন মি। তোমার সমস্ত কাহিনি আমি জানি। তুমি টেনশন কইরো না।

রেজা নামলেন। তাঁকে পিছমোড়া করে বাঁধা হলো। চোখও বাঁধা হলো। তাঁকে একটা গাড়িতে ওঠানো হলো। মনজুরকে তোলা হলো আরেকটা গাড়িতে। এমদাদ নির্দেশ দিলেন, ভাবিদের আর বাচ্চাদের স্টাফ হাউজে নিয়া যাও। মেজর রেজাকে ব্রিগেডিয়ার আজিজের কাছে নিয়া যাও। জেনারেল সাহেবকে আমি নিয়া যাচ্ছি।

পুলিশের ভাষ্য
মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস পুলিশের সিআই (সার্কেল ইন্সপেক্টর)। চট্টগ্রাম জেলার চারটি থানা নিয়ে একটি সার্কেল— রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি। তিনি এই সার্কেলের প্রধান। তাঁর দপ্তর হাটহাজারী থানা থেকে ৫০০ গজ দূরে।

রাতে জেনারেল মনজুরের কনভয় যাচ্ছে। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপারের অফিস থেকে জানানো হলো- কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা রিট্রিট করছে, তোমরা ওয়াচে রাখো। বার্তাটি এসেছে হাটহাজারী থানায়। থানার ওসি সিআই কুদ্দুসকে এটা জানিয়ে দেন।

রাত তিনটার দিকে মনজুরের কনভয় হাটহাজারী পার হয়। কনভয়টি যখন ফটিকছড়ি থানার এলাকায়, তখন ভোর হয়ে এসেছে। কনভয় থেকে নেমে কয়েকজন একটা পাহাড়ের দিকে গেছে বলে কুদ্দুস জানতে পারেন। ফটিকছড়ি থানা থেকে ৫০০ গজ দূরে রাস্তার ডান দিকে একটা করাতকল আছে। তারা দুজনকে করাতকলে নামিয়ে দিয়ে গেছে আশপাশের লোক এটা জেনে যায়। তারা ফটিকছড়ি থানায় এ সংবাদটি পৌঁছে দেয়। খবর পেয়ে কুদ্দুস তার লোকজন নিয়ে করাতকলে যান এবং দুজন দো কর্মকর্তাকে আহত অবস্থায় দেখতে পান। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারেন, জেনারেল মনজুর সামনে পাহাড়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন।

পথে যেতে যেতে কুদ্দুস বিভিন্ন জায়গায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন- কীভাবে ব্যাপারটা সামলাবেন। ঢাকা থেকে বলা হলো, তোমরা ফলো করো, কোন দিকে যায়-টায় দেখো। বিকেলের দিকে কুদ্দুস সবুজসংকেত পেলেন।

এদিকে চট্টগ্রামের বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিনের সমর্থক হাজার হাজার লোক পথে নেমে গেছে। রেডিওতে জিয়া হত্যার খবর শুনে তারা উত্তেজিত। তারা কুদ্দুসকে পথের নিশানা দিচ্ছে- এদিকে যান, ওদিকে যান, ওরা এদিক দিয়ে গেছে ইত্যাদি। শেষমেশ পুলিশের একটা দল পৌছাল এক কুলির বাসায়।

মনজুর পাহাড়ের ওপর থেকে দেখলেন, জনতা চারদিক থেকে জায়গাটা ঘেরাও করে ফেলেছে। পুলিশ যাচ্ছে খুব ধীরে ধীরে, যাতে অপর দিক থেকে গুলি হলে একজনের বেশি হতাহত না হয়। কুদ্দুস শুনেছেন, পলাতকরা মাত্র তিন-চারজন। এটা কুদ্দুসের হিসাবের মধ্যে আছে যে, অপর পক্ষ যদি গুলি করে, তাহলে পুলিশের কতজন মারা যেতে পারে। পাহাড়ের কাছাকাছি গিয়ে জায়গাটা ঘিরে ফেলতে বিকেল পাঁচটা বেজে যায়। পলাতকরা ধরা দেন।

কুদ্দুস দেখলেন, তাঁদের স্থানীয় থানায় (ফটিকছড়ি) রাখা যাবে না। উন্মত্ত জনতা তাঁদের মেরে ফেলতে পারে। তিনি তাঁদের হাটহাজারী থানায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

পুলিশের সঙ্গে জেনারেল মনজুরের ব্যবহার ছিল খুবই সৌজন্যমূলক। কুদ্দুসকে তিনি চিনতেন। কুদ্দুস এর আগে রাঙামাটি থানায় ওসি হিসেবে কাজ করেছেন। মনজুর হেলিকপ্টারে করে প্রায়ই রাঙামাটি যেতেন। কুদ্দুস সচরাচর হেলিপ্যাডে জেনারেলকে অভ্যর্থনা জানাতেন।

মনজুর কুদ্দুসকে বললেন, আমি অবাক হচ্ছি, কুদ্দুস। আমি যত জায়গায় গেছি, দেখেছি, সবাই জিয়ার ওপর ক্ষুব্ধ। অথচ আজ দেখলাম সবাই জিয়ার পক্ষে। ব্যাপারটা কী, কুদ্দুস? যাহোক, তুমি আসায় আমি বেঁচে গেলাম। তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছ।

কথা হচ্ছিল গাড়িতে বসে। কুদ্দুসের ভাষ্য হলো- এভরিথিং হ্যাপেন্ড রেসপেক্টফুলি। তাঁরা হাটহাজারী পৌঁছানোর পর ডিআইজি শাহজাহান এলেন। তাঁকে দেখে মনজুর আশ্বস্ত হলেন। তিনি তাঁকে ভালো জানতেন। তাঁকে জানানো হলো, পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে আদেশ এসেছে, মনজুরকে হস্তান্তর করতে হবে।

পুলিশের আইনে আছে, সেনাবাহিনীর কেউ অপরাধ করে পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তাকে নিকটবর্তী সেনাক্যাম্পে হস্তান্তর করতে হবে। কিছুক্ষণ পরই সেখানে পৌছান ক্যাপ্টেন এমদাদ। ডিআইজি শাহজাহানের কথামতে একটা প্রাপ্তিস্বীকারপত্র লিখে দেন তিনি।

মনজুর এবং তাঁর সঙ্গীরা পুলিশের একটা ট্রাকে বসা। এমদাদের টিমের একজন জেসিও তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিচে নামান। জেসিও রশি দিয়ে তাঁর হাত পা বাঁধেন। পাশেই ছিল একটা জিপ। পেছন দিকটা লম্বাটে। দুই পাশে দুটি বেঞ্চের মতো আসন। মাঝের অংশটি ফাঁকা। জেসিও মনজুরকে ধাক্কা দিয়ে জিপের মধ্যে ফেলে দেন। মনজুর ফাঁকা অংশটিতে উপুড় হয়ে পড়েন। এমদাদ আর জেসিও দুই পাশে সিটের ওপর বসে বুটসুদ্ধ পা রাখেন মনজুরের পিঠে।

মনজুর ও দেলোয়ারের স্ত্রী-সন্তানদের অন্য একটা গাড়িতে তোলা হয়। আরেকটি গাড়িতে হাত-চোখ বাঁধা অবস্থায় রেজাকে তোলা হয়।
ডিআইজি শাহজাহান ক্ষোভে, দুঃখে, অপমানে নির্বাক। পাশে দাঁড়িয়ে দেখলেন সব। কুদ্দুস এসে দাঁড়ালেন তাঁর পাশে। গাড়িগুলো রওনা হতেই উদ্ভ্রান্তের মতো কুদ্দুস ডিআইজিকে বললেন, স্যার, ওরা মনে হয় জেনারেল মনজুরকে মেরে ফেলবে।

যেভাবে নিহত হন জিয়া
মে. জে. মইনুল হোসেন চৌধুরী ১৯৮৯-৯৩ সালে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ওই সময় মোজাফফর ও খালেদ তার সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের কাছ থেকে মইনুল হোসেন চৌধুরী জিয়া হত্যার যে বিবরণ শোনেন, তা হলো :

মতি, মাহবুব ও খালেদের নেতৃত্বে ২৪ ডিভিশনের কয়েকজন অফিসার জেনারেল মনজুরের অজান্তে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে সার্কিট হাউজ থেকে অপহরণ করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন জিয়াকে চাপ দিয়ে বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়, বিশেষ করে সেনাপ্রধান এরশাদসহ অন্যান্য দুর্নীতিবাজ সামরিক অফিসার এবং পাকিস্তানপন্থী প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান ও অন্য দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের মন্ত্রিসভা থেকে অপসরণ করানো। কারণ, এরশাদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হয়রানি নিয়ে জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। সার্কিট হাউজে ঢুকে লে. ক. মতিউর রহমান মাতাল অবস্থায় টলতে টলতে ‘জিয়া কোথায়, জিয়া কোথায়’ বলে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে আসেন এবং পলকেই গজখানেক সামনে থেকে স্টেনগানের এক ম্যাগাজিন গুলি জিয়ার ওপর চালিয়ে দেন। উপস্থিত অন্য অফিসাররা ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে যান।

জিয়া হত্যা অপারেশনটি ছিল মাত্র ৯ মিনিটের। ভোর সাড়ে চারটার কিছু পরে মেজর মোজাফফর ফোন করে জেনারেল মনজুরকে জানান, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড।’ এটা শুনেই মনজুর চুপচাপ বসে থাকেন কিছুক্ষণ। একটু ধাতস্থ হয়ে মোজাফফরকে বলেন, সব সিনিয়র অফিসার যেন সকাল সাতটায় তাঁর দপ্তরে হাজির থাকে।

জিয়ার দাফন
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর লাশ চট্টগ্রাম শহরের বাইরে কোনো এক জায়গায় পুঁতে ফেলা হয়। চট্টগ্রাম সেনানিবাস সরকারের অনুগতদের হাতে চলে যাওয়ার পর লাশটি উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে আসা হয়। সেখানে লাশের ময়নাতদন্ত হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর শরীরের নানা অংশে যে ক্ষতগুলো তৈরি হয়েছিল, তার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটি ছিল এ রকম :
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি লে. জে. (অব.) জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম, পিএসসি-এর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। দেহ শনাক্তকরণ করেন : রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব লে. কর্নেল মাহফুজ।

মৃত্যুর সময়: ৩০ মে ১৯৮১, ০৪.০০টায়।
ময়নাতদন্তের সময়কাল: পয়লা জুন ১৯৮১, ১০.০০টায়।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: দুষ্কৃতকারীরা ১৯৮১ সালের ৩০ মে, শনিবার, ভোর ৪.০০টার সময় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে বলে অভিযোগ আছে। তাঁর শরীরে অনেকগুলো গুলির আঘাতজনিত কারণে ঘটনাস্থলেই মারা যান। লে. কর্নেল মাহফুজের ভাষ্য অনুযায়ী, আরও দুটি মৃতদেহসহ তাঁকে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কাছে ৩০ মে ১৯৮১ আনুমানিক বেলা আড়াইটায় কবর দেয়া হয়। চট্টগ্রাম স্টেশন হেডকোয়ার্টারের লোকদের নিয়ে লে. কর্নেল মাহফুজ পয়লা জুন ১৯৮১ সকালে তাঁর মরদেহ কবর থেকে তুলে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে আসেন। সেখানে পয়লা জুন ১৯৮১ বেলা দশটায় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।

পরীক্ষা করে যা পাওয়া গেছে
দেহে আংশিকভাবে পচন ধরলেও তার কাঠামো ঠিক থাকায় এটা যে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লাশ, তা শনাক্ত হয়েছে। তাঁর দেহে গুলির প্রায় বিশটি ক্ষত ছিল। এগুলো হলো :

ক. ডান চোখের ভেতর দিয়ে একটা গুলি ঢুকে বাঁ কানের পেছনে গুলি ভেদ করে ঘিলুসহ বেরিয়ে গেছে।

খ. মুখের বাঁ দিক থেকে গলার নিচের বাঁ অংশে ৪” x ৩” ক্ষত তৈরি হওয়ায় চোয়াল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।

গ. বুকে ও পেটে গুলির প্রায় দশটি ক্ষত ছিল।

ঘ. সমসংখ্যক গুলি মেরুদণ্ড দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আরও বড় ক্ষত তৈরি করেছে।

ঙ. কোমর ও বাম ঊরুসন্ধির মাঝামাঝি জায়গা দিয়ে গুলি দেহের পেছন দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে ৪” x ৩” ক্ষত তৈরি হয়েছে।
সম্ভবত ব্রাশফায়ারের কারণে এটা হয়েছে।

চ. ডান হাতে গুলির দুটি ক্ষত ছিল।

ছ. পায়ে গুলিজনিত বিক্ষিপ্ত কিছু ক্ষত পাওয়া গেছে।

মরদেহ পরিষ্কার করে জোড়া দেয়া হয়। সব ক্ষতে এবং দেহে তরল ফরমালিন দেয়া হয়। নরম তুলা দিয়ে দেহ ব্যান্ডেজ করা হয়। নতুন সাদা কাপড়ে দেহ মুড়ে দেয়া হয়। কাপড়ের ওপর সিডার অয়েল, ইউক্যালিপ্টাস অয়েল ও আতর ছিটিয়ে চা-পাতাসহযোগে কফিনে রাখা হয়। জাতীয় মান বজায় রেখে কফিনটি মুড়ে তারপর ব্রিগেডিয়ার এ কে এম আজিজুল ইসলাম, লে. কর্নেল মাহফুজ ও লে. কর্নেল মাহবুবুল ইসলামের কাছে বেলা একটায় কফিনটি হস্তান্তর করেন চট্টগ্রাম সিএমএইচের সিও।

স্বাক্ষর/ লে. কর্নেল এ জেড তোফায়েল আহমেদ, প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ

জিয়াউর রহমানের কফিনটি ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা। জাতীয় সংসদসংলগ্ন ক্রিসেন্ট লেকের উত্তরের খোলা চত্বরে কফিনটি সমাধিস্থ করা হয়। এর কিছুদিন পর চট্টগ্রামে ‘সেনা বিদ্রোহে’র বিচার শুরু হয়।

(মহিউদ্দিন আহমদের ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ বই থেকে নেয়া)
সুত্র : মানবজমিন

এই পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ