রোহিঙ্গা গণহত্যার মার্কিন স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার

Wai Wai Nu

ওয়াই ওয়াই নু
বিসিবিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা বলে সোমবার দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ স্বীকৃতি আমার এবং আরও অনেক রোহিঙ্গার জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এমন অবস্থায় কাটিয়েছি, যখন অনুভব করছিলাম, বিশ্ব থেকে যেন আমরা পরিত্যক্ত। বছরের পর বছর আমরা সাহায্যের আবেদন জানিয়েছি, কিন্তু এ আহ্বানে সাড়া পাইনি। আমরা যে সহিংসতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি এবং যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে; এর পরও বিশ্বের আচরণে আমরা ভাবছিলাম, বিশ্ব সম্প্রদায় বুঝি আমাদের অগ্রাহ্যের নীতিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভয়ংকর সেসব ঘটনা স্মরণ আমাদের ফের ‘ট্রমা’য় ফেলছে। যখন বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের মানুষদের হত্যা করা হয়েছে, তখন অন্যরা কীভাবে তা অগ্রাহ্য করে থাকতে পারে? যখন হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে জোর করে আমাদের দেশ মিয়ানমার থেকে বের করে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারল!

যুক্তরাষ্ট্রের এ স্বীকৃতি আইনগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন গত বছর ডিসেম্বরে মালয়েশিয়া সফরের সময়ই বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের আচরণ গণহত্যা কিনা, তা খুবই সক্রিয়ভাবে খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। অবশেষে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশটি আমাদের সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি দিয়ে এ আশা জাগিয়েছে- একদিন আমাদের ওপর অত্যাচারকারী অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই স্বীকৃতির নৈতিক ও আবেগি প্রভাবও আমাদের বুঝতে হবে। অনেকেই এটা অনুভব করছে, এর মাধ্যমে আমাদের একটি প্রজন্মের বেদনা ও ‘ট্রমা’র স্বীকৃতি এসেছে।
আমরা ২০১৭ সালের পরিকল্পিত সহিংসতার শিকার হয়েছি। ওই সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের দুই ভাগ, প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার থেকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। সন্দেহাতীতভাবে ওই সময় আমরা গণহত্যার শিকার হয়েছিলাম। রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের ওই সময়ের ঘটনা যেমন সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তেমনি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক স্বাধীন ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে ‘গণহত্যামূলক কাজ’ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন ওয়াশিংটন এই নৃশংসতাকে ‘জাতিগত নির্মূল’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।

বলাবাহুল্য, অনেক মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনেও ওই গণহত্যার বিষয়টি উঠে আসে। এর পরও আমাদের সম্মিলিত ওই বেদনা বহু দিন আমলেই নেওয়া হয়নি। দশকের পর দশক ধরে আমরা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কর্তৃক অত্যাচারিত হয়ে আসছি। তারা আমাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেয়। এমনকি সন্তান জন্ম দেওয়া ও বিয়ে করার মতো মৌলিক অধিকারও আমাদের ছিল না। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো বেঁচে থাকার মৌলিক বিষয়গুলো থেকে বঞ্চিত করা হয়। মিয়ানমারের সৈন্যরা আমাদের ওপর অত্যাচার করে। তারা রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ এবং হত্যা করতেও দ্বিধা করেনি।

আজ আট লাখেরও অধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের শিবিরে বসবাস করছে। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী বাস করছে। কোথাও কোথাও অবৈধ অনুপ্রবেশের কথা বলে রোহিঙ্গাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং মিয়ানমারে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অবশিষ্টাংশ গণহত্যা সংঘটনকারী সামরিক বাহিনীর বেষ্টনীর মধ্যে বাস করছে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই সেখানে থাকা অবশিষ্ট প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা ফের সহিংসতার শিকার হওয়ার শঙ্কার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের হত্যা, গ্রেপ্তারসহ যে নিপীড়ন চালিয়েছে; সেই জান্তা ফের সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের ওপর চূড়ান্ত হামলা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। বর্তমানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জানা যাচ্ছে, সেখানকার সামরিক সরকার বর্ণবৈষম্যের আরও নীতি গ্রহণ করেছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের তাদের পল্লি ত্যাগ করায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলা হয়েছে, যারা এ আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের জেল দেওয়া হবে। এ মাসের শুরুর দিকে আমার সংগঠন ‘দ্য উইম্যান’স পিস নেটওয়ার্ক’-এর অনুসন্ধানে দেখেছি, তাদের এই বৈষম্যমূলক আইন লঙ্ঘন করায় সামরিক জান্তা সাড়ে আটশ রোহিঙ্গাকে আটক করেছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের অধিক নারী ও শিশু।

যদিও গণহত্যা আমাদের জন্য অতীত বিষয়। এত দিন পর হলেও যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতাকে গণহত্যা হিসেবে যে স্বীকৃতি দিয়েছে, সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে আমার সাত বছরের কারাবাস এবং প্রায় এক দশকের কর্মতৎপরতা আমাকে অন্ধকার সময়ে সাহসী হতে সাহায্য করেছে এবং আশার আলো দেখার গুরুত্ব বুঝিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এ আশাই আজ আমাদের একত্রিত করেছে। পৃথিবীর সব মানব সম্প্রদায় ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবার সম্মানের সঙ্গে বসবাসের অধিকার রয়েছে।

গণহত্যার বিষয়টির স্বীকৃতি বলা চলে নিপীড়নের শিকার হওয়া এবং বেঁচে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমি প্রত্যাশা করি, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এই স্বীকৃতির মর্ম উপলব্ধি করে তাদের কথা বাস্তবে রূপান্তরিত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের বিচারের বিষয়টি এগিয়ে নিতে হাত বাড়িয়ে দেওয়া। একই সঙ্গে মিয়ানমারের মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলকে বোঝানো উচিত। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা যাতে কোনো অস্ত্র না পায়, সে জন্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে ওয়াশিংটন পদক্ষেপ নিক। মিয়ানমার ও তার ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ সেখানকার জেনারেলদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক দণ্ড ঘোষণা করা উচিত।

আমি প্রত্যাশা করি, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ বিশ্বের অন্যান্য দেশের এগিয়ে আসার জন্যও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। আমার বিশ্বাস, অন্যান্য দেশের সরকারও যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতার ঘটনা গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে বিচারের আওতায় আনতে ভূমিকা রাখবে। মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্য সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমরা জানি, বর্তমানে এই ঐক্য সরকারে মিয়ানমার জান্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ের জাতীয় নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়েছেন। ঐক্য সরকারেরও উচিত হবে সামরিক বাহিনীর অপরাধ গণহত্যা হিসেবে জনসমক্ষে স্বীকৃতি দিয়ে অপরাধীদের দায়ী করে রোহিঙ্গাদের অধিকার সমুন্নত করা।

বলাবাহুল্য, মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নৃশংসতাকে গণহত্যা হিসেবে এ সপ্তাহের স্বীকৃতি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমার প্রত্যাশা, যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপের সূচনা করবে।

ওয়াই ওয়াই নু: বার্মিজ মানবাধিকার কর্মী; ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে, যুক্তরাষ্ট্র;
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
সুত্র : সমকাল

এই পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।