টেকনাফের চাঞ্চল্যকর আলো হত্যা মামলায় ৬ জনের ফাঁসি, দুইজন খালাস

টেকনাফের চাঞ্চল্যকর আলো হত্যা মামলায় ৬ জনের ফাঁসি, দুইজন খালাস

আনছার হোসেন, কক্সবাজার
বিসিবিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের চাঞ্চল্যকর মোঃ আলী উল্লাহ আলো (৭) হত্যা মামলায় ৬ জনকে মৃত্যুদন্ডের রায় দেয়া হয়েছে। তবে টেকনাফের আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ ওরফে জাফর আহমদের ছেলে দিদার মিয়াসহ দুইজন বেখসুর খালাস পেয়েছেন।

কক্সবাজারের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল বুধবার (১১ মে) বিকেলে এই রায় ঘোষণা করেন।

ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন মোঃ সুমন আলী, ইয়াছিন ওরফে রায়হান, মোঃ ইয়াকুব, মোঃ ইসহাক ওরফে কালু, নজরুল ইসলাম ও রোহিঙ্গা ছৈয়দুল আমিন ওরফে লম্বাইয়া।

রায়ে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেয়া আসামীর প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ডও করা হয়েছে।

তবে আসামী মুহিবুল্লাহ ও মোঃ দিদার মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বিজ্ঞ বিচারক তাদের বেকসুর খালাস দিয়েছেন।

নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার মো. আলী উল্লাহ আলো টেকনাফ উপজেলা বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আবদুল্লাহর ছেলে।

রায় প্রদানকালে আসামীদের মধ্যে মোঃ সুমন আলী, নজরুল ইসলাম, সৈয়দুল আমিন ও মহিবুল্লাহ আদালত থেকে জামিন নিয়ে পলাতক রয়েছেন। অন্য ৪ জন আসামী যথাক্রমে ইয়াছিন ওরফে রায়হান, মোঃ ইয়াকুব, মোঃ ইসহাক ওরফে কালু ও মোঃ দিদার মিয়া রায় ঘোষণার সময় আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সরকারি কৌশলী পিপি এডভোকেট ফরিদুল আলম। বাদীপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন এডভোকেট আমির হোসেন, এডভোকেট দীলিপ দাশ, এডভোকেট আমিন উদ্দিন, এডভোকেট মোহাম্মদ নছর উল্লাহ প্রমুখ।

আসামীদের পক্ষে এডভোকেট শাহজালাল চৌধুরী, এডভোকেট নুরুল মোস্তফা মানিক, এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম-৪ (স্টেট ডিফেন্স), এডভোকেট সেলিম উদ্দিন রাজু মামলাটি পরিচালনা করেন।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, ২০১১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের গোদার বিল এলাকার রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও ফারজানা পারভীন সুইটির ৭ বছরের শিশু পুত্র মোঃ আলী উল্লাহ আলোকে মোহাম্মদ আবদুল্লাহর কর্মচারী মোঃ সুমন আলী বাড়ির সামনের কাচারি ঘরে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করার উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে যায়। পরে পাখির বাসা দেখানোর কথা বলে মোঃ আলী উল্লাহ আলোকে কাচারী ঘরের সিলিংয়ের উপর তুলে হাত-পা বেঁধে মুখে জোর করে কচটেপ লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এসময় মোঃ আলী উল্লাহ আলো চিৎকার করলে আসামী মোঃ সুমন আলী ও অন্যরা তাকে অপহরণ করার বিষয়টি বাড়ির লোকজন জানতে পেরেছে মনে করে সিলিং উপর জবাই করে নির্মমভাবে হত্যা করে।

এই ঘটনায় খুন হওয়া বিজিবি স্কুলের প্রথম শ্রেণীর ছাত্র মোঃ আলী উল্লাহ আলোর বাবা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বাদী হয়ে ২০১১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ৫ জন আসামীর নাম উল্লেখ করে আরও ৪/৫ জনকে অজ্ঞাত আসামী দিয়ে টেকনাফ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলাটি পর্যায়ক্রমে টেকনাফ থানার এসআই মাহবুবুর রহমান, এসআই হারুনর রশীদ ও টেকনাফ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) স্বপন কুমার মজুমদার তদন্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন।

এই চার্জশিটের বিরুদ্ধে বাদী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ২০১২ সালের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে নারাজি আবেদন করলে বিজ্ঞ আদালত বাদীর আবেদন গ্রহণ করেন এবং ২০১৪ সালের ৪ মার্চ মামলাটি সিআইডিকে অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশে পর্যায়ক্রমে সিআইডির চট্টগ্রামের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হ্লা চিং প্রু, সহকারী পুলিশ সুপার এস.এম সাহাব উদ্দিন আহমদ এবং সর্বশেষ সিআইডি চট্টগ্রাম মেট্টো জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির সরকার তদন্ত করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট এজাহারভুক্ত ৫ জনসহ ৮ জন আসামীর নাম উল্লেখ করে ফৌজদারী দন্ডবিধির ৩০২/৩৪/১০৯/১১৪ ধারায় আদালতে সম্পূরক চার্জশীট দাখিল করেন।

সম্পূরক চার্জশীটে এজাহারভুক্ত ৫ জন আসামি যথাক্রমে নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর থানার কোদ্দ নারায়নপুরের মৃত আফতাব আলীর ছেলে মোঃ সুমন আলী (২৬), ঠাকুরগাঁও জেলার নিশ্চিন্তপুরের মৃত শামছুল হকের ছেলে ইয়াছিন ওরফে রায়হান (২৯), কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের শ্রীপুরের মৃত আসলাম মিয়ার ছেলে মোঃ ইয়াকুব (৩৪), টেকনাফের গোদার বিল গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে মোঃ ইসহাক ওরফে কালু (৩১), টেকনাফের মহেশখালীয়া পাড়ার মৃত নবী হোসেনের ছেলে নজরুল ইসলাম (২৮)।

এছাড়াও তদন্তে এজাহার বহির্ভুত আরও ৩ জন আসামী যথাক্রমে মায়ানমারের মংডু থানার ধনচি পাড়ার মৃত আবদুর রহিমের ছেলে রোহিঙ্গা ছৈয়দুল আমিন ওরফে লম্বাইয়া (৪৭), টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের মাঝের পাড়ার মৃত মৌলভী আবদুল জলিলের ছেলে মহিবুল্লাহ (৪৫), টেকনাফ পৌরসভার লেঙ্গুরবিলের জাফর আহমেদের ছেলে মোঃ দিদার মিয়ার (৩৫) বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে অপহরণ ও হত্যা পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়।

মামলাটি টেকনাফের আমলী আদালত থেকে বিচারের জন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। মামলার ৩ জন আসামি মোঃ সুমন আলী, ইয়াছিন ওরফে রায়হান ও মোঃ ইয়াকুব ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

২০২০ সালের ২৪ জুলাই কক্সবাজারের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলাটির চার্জ গঠন করে বিচারকার্য শুরু করেন। মামলায় ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও তাদের আসামীপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করেন। এরপর আলামত প্রদর্শন ও পর্যালোচনা, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট যাচাই, ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন যাচাই, তিনজন আসামীর ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দি যাচাই, আসামীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, যুক্তিতর্কসহ সবধরণের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে মামলাটি আজ বুধবার (১১ মে) রায়ের জন্য রাখা হয়।

রায়ের জন্য ধার্য্য দিনে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল ঘটনার ১০ বছর ৮ মাস ৪ দিন পর চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির রায় প্রদান করেন।

বিজ্ঞ বিচারক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল তাঁর এজলাসে এক ঘন্টারও বেশি সময় ধরে রায় পড়ে শোনান। এসময় উভয়পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

এই পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ