কথিত অপহৃতদের উদ্ধারে গিয়ে নিজেরাই অপহরণের শিকার রোহিঙ্গাদের হাতে!

কথিত অপহৃতদের উদ্ধারে গিয়ে নিজেরাই অপহরণের শিকার রোহিঙ্গাদের হাতে!

আনছার হোসেন, পালংখালী ১৩ নাম্বার ক্যাম্প থেকে ফিরে
বিসিবিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

কথিত অপহরণের শিকার চার রোহিঙ্গা তরুণকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেরাই অপহরণের শিকার হয়েছেন ৩ বাংলাদেশি। এদের মধ্যে দুইজন বাবা-ছেলেও রয়েছেন।

কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে ঘটনার সুত্রপাত টেকনাফের পালংখালী ইউনিয়নে অবস্থিত ১৩ নাম্বার রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে।

ঘটনার ৭ দিন পর ওই ক্যাম্পে দায়িত্বরত ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সদস্যরা অপহরণের শিকার ৩ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেছেন। তবে কথিত অপহরণের শিকার সেই ৪ রোহিঙ্গা তরুণকে উদ্ধার করা যায়নি।

পুলিশ দাবি করেছে, ওই চার রোহিঙ্গা তরুণ সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে।

উদ্ধার হওয়া তিন বাংলাদেশি হলেন কাশিম আলী (৪৫), তার ছেলে মো. ইসমাঈল (১৫) ও সাদ্দাম হোসেন (১৭)। তারা তিনজনই ১৩ নাম্বার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের পাশের এলাকা পালংখালী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের খারাংখালী বাজার এলাকার বাসিন্দা।

কথিত অপহৃত হওয়া চার রোহিঙ্গা তরুণ হলেন ইয়াছির জোহার (১৫), মো. ছিদ্দিক (১৬), ইয়াছিন আরাফাত (১৯) ও রমজান আলী (১৬)। এরা সকলেই ১৩ নাম্বার রোহিঙ্গা শিবিরের তালিকাভূক্ত রোহিঙ্গা।

অভিযোগ উঠেছিল- চারজন রোহিঙ্গা তরুণকে অপহরণ করে বিক্রি করে দিয়েছে বাংলাদেশি দুই যুবক! অভিযোগ উঠার পর ওই বাংলাদেশি দুই যুবকের একজনের বাবা কাশিম আলী (৪৫) কথিত অপহৃত রোহিঙ্গাদের আত্মীয়স্বজনের সাথে তাদের উদ্ধারে টেকনাফে যান। ওখানে গিয়ে জানতে পারা যায়, বাংলাদেশি দুই তরুণ ইসমাঈল ও সাদ্দাম ১৯ হাজার টাকা দিয়ে শ্রমিক হিসেবে ওই রোহিঙ্গাদের একজনের কাছে ‘বিক্রি’ করে দেয়।

সুত্র মতে, যার কাছে তাদের ‘বিক্রি’ করা হয়েছিল সেই লোকের কাছ থেকে আবদুস সালাম নামের একজন দালাল প্রতিজন এক লাখ ২০ হাজার টাকা দরে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মৌখিক চুক্তি করে। ওই ঘটনার পর রোহিঙ্গারাই শ্রমের জন্য দেয়া ১৯ হাজার টাকা তাকে ফিরিয়ে দিয়ে চার রোহিঙ্গাকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচার করে দেয়।

১৩ নাম্বার রোহিঙ্গা শিবিরে দায়িত্বরত ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সহকারি পুলিশ সুপার (এএসপি) ও সহকারি ক্যাম্প কমান্ডার মো. জালাল উদ্দিন ভূঁইয়া কক্সবাজার ভিশন ডটকমকে এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, কাশিম আলীর সাথে ছেলেদের উদ্ধারে যাওয়া রোহিঙ্গারা তাদের সন্তানরা মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার বিষয়টি নিশ্চিত হন। তারা দালালের মাধ্যমে মোবাইলে ওই চার রোহিঙ্গা তরুণের সাথে কথা বলেন।

তিনি আরও জানান, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর রোহিঙ্গারা কাশিম আলীকে আটকে ফেলেন। শ্রমের জন্য নেয়া টাকা আদায় করতে কাশিম আলীকে জিম্মি করে তার ছেলে মো. ইসমাঈল ও আরেক তরুণ সাদ্দাম হোসেনকে ফোন করে। এসময় ওই দুই তরুণ সেই চার রোহিঙ্গা তরুণ তাদের কাছে রয়েছে জানিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে। রোহিঙ্গারা মুক্তিপণ দেয়ার ভান করে তাদের টাকা নেয়ার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় আসতে বলে। ওই দুই যুবক টাকার জন্য এলে স্থানীয় দালালদের সহায়তায় রোহিঙ্গারা তাদের আটকে ফেলে। পরে তাদের টেকনাফের জালিয়াপাড়া এলাকার এক মহিলা ভিডিপি সদস্য রশিদা বেগমের বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখে।

এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বিষয়টি টেকনাফ থানা ও উখিয়া থানা পুলিশকে জানানো হয়। তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ নেয়া হয়। কিন্তু দু’টি থানার কোনটিই বাংলাদেশিদের অভিযোগ গ্রহণ করেনি এবং অপহৃত তিনজনকে উদ্ধারে কোন ধরণের তৎপরতাই গ্রহণ করেনি।

সহকারি পুলিশ সুপার মো. জালাল উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, উখিয়া ও টেকনাফ থানা পুলিশ অভিযোগ না নেয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে এপিবিএনের একটি দল টেকনাফে অভিযান চালিয়ে অপহৃত তিন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে।

তিনি জানান, গত ৯ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা চার তরুণের কথিত অপহরণের ঘটনা ঘটে। পরে প্রথম দফা অভিযান চালিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর সাদ্দাম হোসেনকে (১৭) এবং দুইদিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর কাশিম আলী (৪৫) ও তার ছেলে মো. ইসমাঈলকে উদ্ধার করা হয়।

এএসপি জালাল উদ্দিনের মতে, কথিত অপহরণের শিকার চার রোহিঙ্গা উদ্ধার হয়নি। তারা আর কখনও উদ্ধারও হবে না। যেহেতু তারা ইতোমধ্যেই সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে।

তবে এ ব্যাপারে এখনও কোন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

১৩ ও ১৯ নাম্বার রোহিঙ্গা শিবিরের সহকারি ক্যাম্প কমান্ডার মো. জালাল উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, বর্তমানে ১৩ নাম্বার ক্যাম্পে অন্তত ৪৬ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে।

এই পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ